মোসলেম উদ্দিনে’র ৪ দশকের সঙ্গী কা’লো পাঞ্জাবি আ’র লুঙ্গি

দীর্ঘ সাড়ে চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বগুড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দিনের পরনের পোশাক হলো কালো পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। বঙ্গবন্ধুকে হারানোর বেদনা এবং তার প্রতি ভালোবাসা থেকে প্রতীকী প্রতিবাদস্বরূপ তিনি এই পোশাক পরেন। বর্তমানে বয়সের ভারে নুইয়ে পড়া এই বীর মুক্তিযোদ্ধা অসুস্থ। বস্তির একটি ঝুঁপড়ি ঘরে শুয়ে বসে দিন কাটে তার।

মোসলেম উদ্দিনকে চেনেন না, এমন লোক বগুড়ার চেলোপাড়ায় খুঁজে পাওয়া যাবে না। এলাকার তরুণ আমিনুল ইসলাম বললেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা হয়েও তিনি কখনো অন্যের মুখাপেক্ষী হননি। রাতদিন পরিশ্রম করেন। বৃদ্ধ বয়সেও সড়কের পাশে ডাল-ভাত বিক্রি করে জীবন যুদ্ধ করেছেন। আমরা কখনো এ মানুষটিকে কারো কাছে হাত পাততে দেখিনি।’

চেলোপাড়া রেলব্রিজ ঘেঁষে সারি সারি ঝুপড়িঘর। সেখানে মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দিনের বাড়ি কোনটা, জানতে চাইলে ৯ বছরের শিশু মুকিত হাত দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘ওই যে দেখেন রেললাইনের নিচে টিনের ঘরের সামনে মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দিনের সাইনবোর্ড ঝুলছে। ওখানেই তার বাড়ি।’

কিছুদূর হেঁটে বাড়ির সামনে গিয়ে দেখা গেল ছোট্ট সাইনবোর্ডে লেখা, ‘মুক্তিযোদ্ধা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, দেশ ও জনগণের অতন্দ্রপ্রহরী ১৯৭১ সালের বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোসলেম উদ্দিন।’

বগুড়া শহরের উত্তর চেলোপাড়া রেলওয়ে বস্তিতে থাকেন তিনি। রেললাইনের নিচে বাড়িতে নামতে গেলে মনে হয় গুহার মতো। টিনের চালের ভাঙা অংশ দিয়ে দেখা যায় সূর্যের আলো। চারদিকে ঘিঞ্জি স্যাঁতসেঁতে আর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ঘরের মধ্যে দাঁড়ালে চালে মাথা লেগে যায়। এ বাড়িতেই মোসলেম উদ্দিনের ১৫ সদস্যের বিরাট সংসার। তার স্ত্রী সাজেদা ও মেয়ে রেশমা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ।

বগুড়ার শহীদ খোকন পার্কের পশ্চিম পাশে রাস্তার দেয়াল ঘেঁষে ড্রেনের ওপর বসে ডাল-ভাত বিক্রি করতেন মোসলেম। মেয়েরা বাড়িতে রান্না করে দিতো। আর প্রতিদিন সকালে ভারে করে সেই খাবার নিয়ে আসতেন ফুটপাতের দোকানে।

তার হোটেলে পাঁচ থেকে ১৫ টাকায় পেটভরে খাওয়ার সুযোগ ছিল। মোটা চালের ভাত, ডাল, আলুভর্তা, কচুভর্তা, পেঁয়াজু ও মাছভাজা বিক্রি করতেন তিনি। ভাত প্রতি প্লেট দুই টাকা, আলু অথবা কচুভর্তা তিন টাকা, মাছভাজা পাঁচ টাকা। সঙ্গে ডাল ফ্রি। রিকশা ও ভ্যানের চালকরাই তার হোটেলের খদ্দের ছিলেন।

এত অল্প রোজগারে সংসার চলে কীভাবে, জানতে চাইলে মোসলেম বলেন, ‘হামি কুনু সময় লিরাশ (নিরাশ) হই না। ছোলপোল মাঝেমধ্যে লিরাশ হয়, তখন হামি তারকোরোক কই পরের ধন না লিবে (নেবে), চিরদিন সুকে অবে (রবে)। হামার একফোঁটা অক্তও বৃথা যাবার পারে না। হামি ভাঙা ঘরোত থাকলেও অনেক সুকি মানুষ। দিন আনি দিন খাই।

খালি কষ্ট একটাই—ট্যাকার অভাবে ছোটপোলক পড়ালেকা শিকাবার পারনু না। তবে এখন অল্প অজগারের মধ্যেই লাতিগুলাক পড়াচ্চি। হামার এক লাতি (নাতি) মেধা লিয়া বৃত্তি পাছে।’

মোসলেমের বড়ছেলে মুকুল প্রামাণিক নবম শ্রেণি পর্যন্ত পড়ালেখা করেছেন। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে ছাত্র পড়ান। মেজছেলে হোসেন বাজারে তরকারি বিক্রি করেন আর ছোটছেলে আমির ব্যাটারিচালিত রিকশা চালান। তারাও সাধ্যমতো সহযোগিতা করেন বাবাকে।

মোসলেম জানান, কখনো কোথাও তিনি মুক্তিযোদ্ধার সম্মান পাননি, সংবর্ধনা তো দূরে থাক। এটা নিয়ে তার কোনো আক্ষেপও নেই। সংবর্ধনা পাওয়ার আশায় তো যুদ্ধ করেননি। তবে একবার স্বাধীনতা দিবসে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডাকা হয়েছিল তাকে। দোকান বন্ধ রেখে গিয়েছিলেন। রাতে ভালো খাবার খেয়ে এসে বাড়ি ফিরে দেখেন ছেলেমেয়েরা না খেয়ে বসে আছে। সেই থেকে এসব অনুষ্ঠানে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। একদিন না খাটলে যে পরিবারের সদস্যদের মুখে ভাত জুটবে না।

মোসলেমের ছেলে হোসেন বলেন, ‘আব্বা হামাকোরোক যুদ্ধের গপ্প করে। হামাকেরে বুক ভরে যায় তার গপ্প শুনে। আব্বা কয়, দেশের জন্য যুদ্ধ করিচি বাবারা। তোমরাও দেশেক ভালোবাসো।’

মুক্তিযুদ্ধের সময় ২২-২৩ বছরের টগবগে যুবক ছিলেন মোসলেম উদ্দিন। বগুড়ার গাবতলী উপজেলার নেপালতলী ইউনিয়নের কদমতলী গ্রামে ছিল তাদের বাড়ি। বাবার নাম রহিম উদ্দিন প্রামাণিক। পড়ালেখা খুব একটা করেননি। সেসময় ব্যবসার পাশাপাশি কৃষিকাজও করতেন।

একদিন গরু বিক্রি করতে নারুয়ামালা হাটে যান। একসময় তিনি লক্ষ্য করেন চলন্ত ট্রেন থেকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী গুলিবর্ষণ করছে। তার কানের পাশ দিয়ে গুলি চলে যায়। কোনো রকমে প্রাণে বেঁচে যান তিনি। সেখানেই মোসলেম উদ্দিন প্রতিজ্ঞা করেন, এভাবে বসে থেকে আর নয়, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীকে উপযুক্ত জবাব দিতে হবে।

বাড়ি ফিরে প্রতিবেশীদের সঙ্গে কথা বলেন। অনেকেই তার সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেন। মোসলেম উদ্দিনসহ ২৫-২৬ জনের একটি দল প্রশিক্ষণ নিতে চলে যায় ভারতে। প্রশিক্ষণ শেষে যোগ দেন ৭ নম্বর সেক্টরে। গ্রুপ কমান্ডার সোনাতলার চরপাড়া গ্রামের আবদুল ওয়ারেসের নেতৃত্বে যুদ্ধ করেন তিনি। বগুড়ার ভেলুরপাড়ায় হানাদারদের সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে বীরত্বের পরিচয় দেন মোসলেম ও তার সহযোদ্ধারা।

চেলোপাড়ার ঝুঁপড়ি ঘরে শুয়ে থাকা অসুস্থ বীর মুক্তিযোদ্ধা মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘কোনো লাভের আশায় যুদ্ধ করিনি। তবে মন খারাপ হয়ে যায় তখনই যখন দেখি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মান করা হচ্ছে না। তারা অবহেলিত হয়ে রয়েছেন। তবে সুখের কথা এই যে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী মুক্তিযোদ্ধাদের বেশ কিছু সুযোগ- সুবিধা দেয়ার কারণে কোনোরকমে প্রাণ রক্ষা হচ্ছে। নয়তো এই বৃদ্ধ বয়সে পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে মরতে হতো।’

About অনলাইন ডেস্ক

View all posts by অনলাইন ডেস্ক →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *